প্রথম পাতা » বিদেশ, রাজনীতি

ওবামার বিজয়ঃ এটি নীতির বদল না রঙের বদল? - পর্ব: ১

লিখেছেন: CarefullyCareless

মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০০৮ – ১১:১১ পূর্বাহ্ণ টি মন্তব্য


(কৃতজ্ঞতা: ডা. ফিরোজ মাহবুব কামাল)
মার্কিন নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন বারাক হোসেন ওবামা। তাঁর বিজয়ে আনন্দ-উৎসব হয়েছে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বহুদেশে। কোন এক ব্যক্তির নির্বাচনী বিজয়ে দেশ, বর্ণ, ভাষা ও ধর্মের গন্ডি ডিঙ্গিয়ে এভাবে আনন্দ প্রকাশের ঘটনা বিরল। নির্বাচন-পুর্বে মিশরে এক জরিপ চালিয়েছিল “দি ইকোনমিষ্ট”। সে জরিপে প্রকাশ পায়, ভোট দেওয়ার অধিকার থাকলে শতকরা ৯১ ভাগ মিশরীয়ই ভোট দিত বারাক ওবামাকে। ব্রাজিলের নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী নাম পরিবর্তন করে ভোট চেয়েছে ওবামা নামে। অনেকের ধারণা, ওবামার বিজয়ে মার্কিন রাজনীতিতে শুরু হবে নতুন যুগ। তাদের কথা, ওবামা হলেন একাবিংশ শতাব্দীর নেতা। তাদের যুক্তি, তাঁর পিতা আফ্রিকার মুসলিম পরিবারের। মা একজন শ্বেতাঙ্গ মার্কিন। তাঁর শৈশব কেটেছে ইন্দোনেশিয়ায়। লেখাপড়া করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মজীবনের শুরুতে সমাজকর্মী রূপে কাজ করেছেন দরিদ্র শ্রমিক এলাকায়। এভাবে তার চরিত্রে সংমিশ্রণ ঘটেছে বিচিত্র ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর পদে বসবার জন্য এমন বিচিত্র অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ নিশ্চয়ই দুর্লভ ও গুরুত্বপূর্ণ -যা অতীতে কোন মার্কিন প্রেসিডেন্টেরই ছিল না।

প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ৮ বছরের শাসনামলে বিশ্বজুড়ে সংঘটিত হয়েছে অসংখ্য জঘন্য অপরাধ। দীর্ঘকাল ব্যাপী যুদ্ধে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলছে ইরাক ও আফগানিস্তানে। দেশদুটিতে নিহত বা আজীবনে জন্য পঙ্গু হয়েছে বহুলক্ষ নিরপরাধ মানুষ। ধ্বংস হয়েছে বহু হাজার ঘরবাড়ি ও দোকান-পাঠ। অসংখ্য মানুষ কারারুদ্ধ ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে বাগরাম, আবুগারিব ও গুয়ান্তানামোর ন্যায় কারাগারে। বিশ্বের বহু শহর ও জনপদ থেকে অসংখ্য মানুষকে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে। বুশের যুদ্ধাংদেহী নীতির কারণেই আযাব নেমে এসেছে বিশ্ব-অর্থনীতিতে। বন্ধ হয়েছে বহু কলকারখানা ও ব্যাংক। চাকুরি হারিয়েছে শুধু দরিদ্র দেশের কর্মজীবী লক্ষ লক্ষ মানুষই শুধু নয়, বহু লক্ষ মার্কিনীও। ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় গৃহহীন হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। বিগত সত্তর বছরের ইতিহাসে এরূপ অর্থনৈতিক বিপর্যয় দ্বিতীয়টি আসেনি। ৮ বছর আগে একজন মার্কিনীর পক্ষে গরীব হওয়াই অস্বাভাবিক ছিল, আর এখন স্বচ্ছল থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ বহু হাজার বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে নিছক মানুষ হত্যায় ও দেশ-ধ্বংসে। অথচ এ অর্থে বিপুল কল্যাণ হতে পারতো বিশ্বজুড়ে। তিনি যখন ক্ষমতায় আসেন তখন মার্কিন রাজস্ব-ভান্ডারে আড়াই শত বিলিয়ন ডলারের বেশী উদ্ধবৃত্ত ছিল, অথচ এখন দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে দায়গ্রস্ত দেশ। যুদ্ধ এখন আর শুধু আফগানিস্তান ও ইরাকে সীমাবদ্ধ নয়, গ্রাস করছে প্রতিবেশী দেশগুলোকেও। বিশ্ব-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ রাখা এখন মার্কিনীদের সামর্থের বাইরে। প্রচন্ড বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পূঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা। ফলে অসম্ভব হয়ে পড়েছে বিশ্ব-শক্তি রূপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টিকে থাকাটাও। বুশের ভ্রান্ত-নীতিই মূলতঃ সম্ভব করেছে ওবামার বিজয়। তার কারণে সমগ্র বিশ্বটাই মার্কিনীদের জন্য বিপদজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিপ্রান্তে মার্কিন নাগরিকগণ পরিণত হয়েছে ঘৃণার পাত্রে। এমন ঘৃণার কারণে মার্কিন পরিচয় নিয়ে অন্যদেশের রাজপথে চলাফেরা করাটিও এখন বিপদজনক। তাই ওবামা না হলে আরেকজন ওবামাকে সন্ধান করা তাদের জন্য জরুরী হয়ে পড়েছিল। এমন এক পরিস্থিতে ওবামা আবির্ভূত হয়েছেন মুক্তির অবতার রূপে।

আগামী ২০ই জানুয়ারীতে ওবামার দখলে যাচ্ছে হোয়াইট হাউস। তখন তিনিই হবেন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি। তাঁর উপর দায়ভার বিশাল। মার্কিন নীতি বলতে বিশ্ববাসী বুঝে, বিরামহীন যুদ্ধ। বুঝে, নিরীহ নারী-পুরুষ ও শিশু হত্যা ও পঙ্গুত্বসাধন। বুঝে, আবু গারিব, গোয়ান্তোনামো বে’ ও বাগরামের কারাগার। বুঝে, বিয়ের আসর, মসজিদ-মাদ্রাসা ও বসতগৃহের উপর বোমা বর্ষন। বুঝে, স্বৈরাচারি জালেম শাসকদের প্রতি নিঃশর্ত্ব সমর্থণ। বুঝে, ইসরাইলের বর্বর আগ্রাসান, বোমা-বর্ষন, ফিলিস্তিনি-ভূমির জবরদখল। প্রশ্ন হল, ওবামা কি এমন মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবেন? নির্বাচনী প্রচারণায় শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, তিনি বিশ্বকে পাল্টে দেওয়ার ওয়াদা করেছেন। সে ওয়াদা তিনি কতটা পূরণ করতে পারবেন? এ নিয়ে বিশ্ববাসী যে হতাশ হবে সে আশংকাই কি কম? কারণ, যে দুর্বৃত্তি ও সন্ত্রাসের রাজত্বকে মার্কিন সরকার যুগ যুগ ধরে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যা দিয়েছে সেটির নির্মূলে যে নৈতিক বল ও সাহস চাই সেটি কি ওবামার আছে? নির্বাচনী প্রচারে ফেরেশতা সাজা কারো জন্যই কঠিন নয়। কঠিন নয় এমনকি অতিশয় সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তের জন্যও। কঠিন ছিল না হিটলারের জন্যও। কিন্তু বাস্তবে কিছু করতে হলে তো প্রবল শক্তি চাই নীতি ও নৈতিকতায়। সমস্যা বাধে তো সেখানেই, কারণ সবার সেটি থাকে না। সে নৈতিক বলে ওবামার ঘাটতি কি কম? তারই কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক।

ওবামা ইরাক যুদ্ধের বিরোধীতা করলেও আফগানিস্তানের উপর হামলার বিরোধীতা করেননি। বরং সে হামলার তিনি ঘোরতর সমর্থক। এর অর্থ দাঁড়ালো, ওবামা আদৌ যুদ্ধাবিরোধী নন। এবং বিরোধী নন বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্য বিস্তারেও। শুধু ইরাক যুদ্ধটিই নয়, আফগানিস্তানের উপর যুদ্ধটিও হয়েছিল অতি অন্যায় ভাবে। তালেবানগণ কোন দেশের বিরুদ্ধে একটি গুলিও ছুড়েনি। কোথাও কোন মারাণাস্ত্র বা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেনি। ১১ই সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে যারা হামলা করেছিল তাদের কেউই আফগান ছিল না। আফগানিস্তান যদি কাউকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে থাকে তবে সে অপরাধে বিচার হতে পারতো আন্তর্জাতিক আদালতে। অন্যদেশের রাজনৈতিক শত্রুদের আশ্রয়দানের কাজ তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্য জগতের বহুদেশই করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আশ্রয় দিয়েছিল ইরানের বিতাড়িত বাদশাহ মহাম্মাদ রেজা শাহকে। রেজাশাহ ইরানের বিপুল সম্পদ নিয়ে সেখানে পালিয়েছিল, ষড়যন্ত্র করছিল আবার ক্ষমতা দখলের। তাই এ অপরাধে একটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুকে কি বৈধ বলা যায়? অথচ মার্কিনীরা আফগানিস্তানে সেটিই করেছে। আসলে এটি ছিল বাহানা মাত্র। মার্কিনীদের কাছে তালেবানদের মূল অপরাধ, তারা ইসলামের মৌল-শিক্ষায় বিশ্বাস করে, এবং সেটির পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জানমালের কোরবানীতেও রাজী। তারা দুষমন পাশ্চাত্যের সেকুলার দর্শনের। এদিক দিয়ে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একমাত্র তারাই ব্যতিক্রমধর্মী। পাশ্চাত্য মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এমন বিদ্রোহ মার্কিনীদের কাছে অসহ্য। আর এখান থেকেই মূল শত্রুতার শুরু। পুঁজিবাদী বিশ্ব এককালে কম্যুনিজমকে তাদের দর্শন ও মূল্যবোধের শত্রু মনে করত। তারা এখন কম্যুনিজমের স্থানে বসিয়েছে ইসলামকে। এমন অভিন্ন পুঁজিবাদী চেতনা বারাক ওবামারও। তাঁর কথা, তালেবানদের ইসলাম হল রাডিক্যাল ইসলাম – এবং এ ইসলাম থেকেই জন্ম নেয় জ্বিহাদ। সে জ্বিহাদই তার দৃষ্টিতে সন্ত্রাস। তাই ওবামার কাছে আফগানিস্তান হল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মূল ফ্রন্ট-লাইন। কথা হল, বুশ ও ম্যাককেইনের চেয়েও ওবামা কি এক্ষেত্রে কম যুদ্ধাংদেহী? বরং পার্থক্য হল, বুশ বা ম্যাককেইন কেউই আফগানিস্তানে আরো অধিক মার্কিন সৈন্য পাঠাতে আগ্রহী নয়। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রচন্ড উৎসাহ ওবামার। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি আফগানিস্তানে আরো মার্কিন সৈন্য পাঠানোর কথা একবার নয়, বহুবার বলেছেন। অথচ মার্কিন বাহিনী সেখানে যে কাজটি করছে সেটি শান্তি প্রতিষ্ঠা নয়। বিগত সাত বছরের মার্কিন-জবরদখলে শান্তির পরিমাণ সেখানে একটুও বাড়েনি, বরং বেড়েছে রক্তপাত, ধ্বংস, জেল-জুলুম ও নানা রূপ অশান্তি। বেড়েছে আফিম চাষ। মার্কিন সৈন্যরা সেখানে নিরপরাধ নাগরিক হত্যায় লিপ্ত। হত্যাকান্ডের পরিধি ও কলেবর বাড়াতে এখন নিয়মিত হামলা করছে প্রতিবেশী পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও। হামলা করছে এমনকি বিয়ের মজলিসে। ক’দিন আগে দক্ষিণ আফগানিস্তানের এক গ্রামে বিয়ের মজলিসে হেলিকপ্টার থেকে মিজাইল ছুঁড়ে ৫০ জনেরও বেশী নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যা করেছে। এমন ঘটনা ঘটছে অহরহ। গত ৭ই নভেম্বর পাকিস্তানের দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের এক গ্রামে এরূপ হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে ৮ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে। কিছুদিন আগে এমন আরেক হামলায় হত্যা করেছিল ২০জনকে। যে কোন সভ্য দেশে পথে-ঘাটে পাখি-শিকারেরও প্রতিবাদ হয়; বিচারও হয়। কিন্তু এরূপ নৃশংস মানব-হত্যার বিরুদ্ধে কোন বিচার নেই; প্রতিবাদও নেই। এ অবধি কোন মার্কিন সৈন্যের সাজা হয়নি। ওবামাও নীরব। আর এটিই হল মার্কিন মূল্যবোধ। এবং ওবামা সে মূল্যবোধেরই বিশ্বব্যাপী প্রসার চায়।

(চলবে)

VN:F [1.0.8_357]
রেটিং: 0.0/5 (0 ভোট)
বুকমার্ক:
  • Facebook
  • Google
  • Digg
  • Technorati
  • del.icio.us
  • Live
  • YahooMyWeb

ট্যাগঃ


  • ডাক্তার আইজুদ্দিন
    ডাক্তার আইজুদ্দিন ১৮ নভেম্বর ২০০৮ ১১:২২ পূর্বাহ্ণ

    (N) (N) (N) (N)

    ফিরোজ মাহবুব কামাল নামক বরাহটি সকল বিষয়ে লাদিয়া যায়

    VN:F [1.0.8_357]

    [জবাব]

  • দৌবারিক
    দৌবারিক ১৮ নভেম্বর ২০০৮ ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ

    আপনার প্রিয়া লেখকের লেখা না পড়েই মাইনাস দিলাম । :(
    সরি :(

    VN:F [1.0.8_357]

    [জবাব]

  • গেদু চাচা
    গেদু চাচা ১৮ নভেম্বর ২০০৮ ১২:২৯ অপরাহ্ণ

    (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N) (N)
    যা দিছি চলবো নি? ডাক্তরের লং টাইম চিকিৎসা দরকার কারণ সে অসুস্থ।

    VN:F [1.0.8_357]

    [জবাব]

  • নীড় সন্ধানী
    নীড় সন্ধানী ১৮ নভেম্বর ২০০৮ ১২:৪৭ অপরাহ্ণ

    এই লাদি প্রথম আলোতে ব্যান খাইছে। এখন এইখানে পায়খানা করতে আইছে

    VN:F [1.0.8_357]

    [জবাব]

  • মিজান
    মিজান ১৮ নভেম্বর ২০০৮ ১১:৪৫ অপরাহ্ণ

    :-?

    VN:F [1.0.8_357]

    [জবাব]

ট্র্যাকব্যাকঃ

মন্তব্য করুন!

এই পোস্টের কমেন্ট ফিড সাবস্ক্রাইব করুন!

লগ ইন করতে চান?

আপনার মন্তব্য বা আপনার সাইটের ট্র্যাকব্যাক যোগ করুন। ভালো, সুন্দর, টপিক কেন্দ্রিক মন্তব্য করুন। স্প্যাম না করার অনুরোধ রইলো।

Ekushey Inline virtual Bangla keyboard
------------(মাউস ক্লিক করে বাংলা লিখুন)------------

Subscribe without commenting.

:) :( ;) :D ;;) >:D< :-/ :x :"> :P =(( :-O X( :> B-) :-S >:) :[ :] :| =)) :-B :-h I-) <:-P :-? =D> :-w :!! :-" :-$ =P~ (*) (Y) (N) (^) (D) (C) (B) (G) (F) (W)