প্রথম পাতা » দেশ, নির্বাচন ২০০৮, রাজনীতি

বাংলাদেশে নির্বাচনঃ সংঘাত বাড়বে কি রাজনীতিতে? - শেষ পর্ব

লিখেছেন: CarefullyCareless

বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০০৮ – ৯:৪৯ অপরাহ্ণ টি মন্তব্য

(কৃতজ্ঞতা: ডা. ফিরোজ মাহবুব কামাল)
(প্রথম পর্বের পর)
নির্বাচন ব্যর্থ হওয়ার আরেকটি গুরুতর কারণও রয়েছে। নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অর্থ রায় দেওয়া। এখানে রায় দেয় জনগণ। জনগণের সে রায়ের বলেই বিজয়ীরা পায় দেশ শাসনের অধিকার। গণতন্ত্র তাই ভোটার বা সাধারণ নাগরিকের উপর দেশ-শাসনে বড় রকমের দায়বদ্ধতা দেয়। রাজতন্ত্রে বা স্বৈরতন্ত্রে সে অধিকার ও সুযোগ সাধারণ মানুষের থাকে না। বিলেত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নাগরিকগণ শুধু ভোটই দেয় না, আদালতে রায়ও দেয়। তাদেরকে দেওয়া হয় জুরিষ্টের মর্যাদা। তাদেরকে বেছে নেওয়া হয় ভোটার তালিকা থেকে লটারীর ন্যায় র্যাওন্ডম পদ্ধতির মাধ্যমে। তাই ভাগ্যগুণে যে কোন ভোটারই হতে পারেন জুরিষ্ট। এবং জুরিষ্ট হিসাবে আদালত থেকে ডাক পড়লে সে কাজে যোগ দেওয়া তার উপর বাধ্যতামূলক হয়।সে দায়িত্বপালনে অবহেলা হলে সেটি গণ্য হয় শাস্তিযোগ্য অপরাধরূপে। ব্যারিস্টারগণও আদালতে এরূপ জুরিষ্টদের উদ্দেশ্য করেই তাদের যুক্তিপ্রমাণ পেশ করে, জজকে উদ্দেশ্য করে নয়। ভোটাররা আদালতে বসে যাকে দোষী বা নির্দোষ সাব্যস্ত করেন জজ তাতে কোন পরিবর্তন আনতে পারে না। জজের কাজ,জুরিষ্টদের দ্বারা দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির উপর আইন মোতাবেক শাস্তির প্রয়োগ এবং নির্দোষ ব্যক্তির মুক্তিদান। আর নির্বাচনে আদালত বসে সমগ্র দেশ জুড়ে। এখানে জুরিষ্ট বা রায়প্রদানকারি হল প্রতিটি ভোটার। বাদী-বিবাদী হল প্রার্থীরা। এবং উকিলের ভূমিকায় নামেন দেশের জ্ঞানীজনেরা। নির্বাচনী কমিশনারের কাজ,বিচারকের দায়িত্বপালন। সফল নির্বাচনের জন্য প্রত্যেকের দায়িত্বই এখানে গুরুত্বপূর্ণ, সে দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হলে বিফল হয় নির্বাচন। তবে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ভোটারদের। আদালতের রায়দানের ন্যায় নির্বাচনের রায়দানের কাজও মূলতঃ তাদের। ন্যায় ও সত্যের প্রতি তাদের সদা নিষ্ঠাবান থাকতে হয়।নইলে নির্বাচিত হয়ে অকল্যাণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা।

কিন্তু কথা হল,যোগ্যতা ছাড়া কোন দায়িত্বই কি সঠিক ভাবে পালিত হয়? রাস্তায় ঝাড়ু দিতেও কিছু যোগ্যতা লাগে। নইলে আবর্জনা জমে লোকালয়ে। আর ভোটারদের অযোগ্যতায় আবর্জনা জমে প্রশাসনে ও রাজনীতিতে। তখন বিপর্যয় নেমে আসে সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে। বাংলাদেশে অতীতে সর্বগ্রাসী দূর্নীতি, বাকশালী স্বৈরাচার,দুর্ভিক্ষ, ভারতীয় দখলদারি, অর্থনৈতিক ধ্বস এবং রক্ষিবাহিনীর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নেমে এসেছিল ভোটারদের সে অযোগ্যতার কারণেই। নির্বাচনে বা আদালতে রায় দিতে যে যোগ্যতাটি অপরিহার্য সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও নয়, বরং সেটি হল সত্য ও ন্যায়ের পক্ষ নেওয়ার নৈতিক বল। তাই গণতান্ত্রিক দেশে কারো ডিগ্রি বা অভিজ্ঞতা দেখে আদালতে ডাকা হয় না। কারণ সেরা ডিগ্রি বা অভিজ্ঞতা ন্যায়পরায়ন হওয়ার গ্যারান্টি দেয় না। ডিগ্রিধারী বা অভিজ্ঞ ব্যক্তিটিও লিপ্ত হতে পারে অতি জঘন্য অপরাধ কর্মে। বাংলাদেশে এমন দুর্বৃত্ত ডিগ্রিধারী এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তির সংখ্যা তো লক্ষ লক্ষ। অপর দিকে যে ব্যক্তির বিবেক ভেসে যায় গায়ের রঙ, ভাষা,ভূগোল,দল, গোত্র বা পরিবারের প্রতি আনুগত্যে, তার কি সে সামর্থ থাকে? থাকে না। আদালতের জুরিষ্টদের জন্য এমন ভাবে ভেসে যাওয়াটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রায় দানের জন্য আলোকিত হতে হয় বিবেককে। নইলে ব্যর্থ হয় বিচার। অপরাধী ব্যক্তি তখন জেলে না গিয়ে সমাজে নেমে আসে। তখন দুর্বৃত্তির প্লাবন শুরু হয় রাষ্ট্র জুড়ে।তাই রাষ্ট্র দুর্বৃত্ত-কবলিত হলে দায়ী শুধু সরকার নয়,জনগণও।তখন প্রমাণ মেলে,সরকার নির্বাচনের যে গুরু দায়িত্ব জনগণের উপর ছিল সেটিই পালিত হয়নি। তাই সফল রাষ্ট্র নির্মাণে রাস্তাঘাট, কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্ব থাকলেও সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হল বিবেকমান মানব-নির্মাণ।সভ্য জাতিরা তাই গুরুত্ব দেয় চরিত্র গড়ায়। তবে সে যোগ্যতা নিছক রাজনৈতিক বক্তৃতায় সৃষ্টি হয় না। বাড়ে না পড়া-লেখার সামর্থ বাড়াতে। এজন্য চাই উন্নত জীবন-দর্শন। মুসলমানের জীবনে সে দর্শনটি হল ইসলাম। রাষ্ট্রের কল্যাণে ইসলাম শুধু ভোটদানেই ন্যায়নিষ্ঠ করে না, নিষ্ঠাবান করে সে লক্ষ্যে অর্থদান, শ্রমদান, এমনকি প্রাণদানেও। ইসলামে এমন কাজ পবিত্র জ্বিহাদ। কিন্তু সেকুলারিজম ব্যক্তির জীবন থেকে সে বিপ্লবী শক্তিটাই কেড়ে নেয়। দেয় একটি পার্থিব লাভ-লোকসানের ধারণা। এমন চেতনার প্রসার বাড়লে শাড়ী-লুঙ্গি বা অর্থ দিয়েও তখন ভোট কেনা যায়। বাংলাদেশে মূলতঃ সেটিই হচ্ছে।

অথচ আল্লাহর সামনে জবাবদিহীতার ভয় বাড়লে মিথ্যাচারি দুর্বৃ্ত্তকে ভোটদান দূরে থাক,ভোটারগণ সচেষ্ট হয় তার নির্মূলে।এমন কাজ তো জ্বিহাদ। ইসলামের লক্ষ্য,সমাজে এমন দায়িত্বশীল উদ্যোগী মানুষের সৃষ্টি। সমাজে এরা সুনীতির বিজয় আনে। নবী (সাঃ)তার জীবনের সবচেয়ে অধিক সময় ব্যয় করেছেন এমন সৃষ্টিশীল কাজে। এজন্যই তিনি ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। মানবিক গুণের পরিচর্যা এতটা বেড়েছিল যে,যারা ভেড়া চড়াতেন বা ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষিকাজ করতেন তারাও পরিণত হয়েছিলেন সুযোগ্য কাজী বা বিচারকে। ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বিচার-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তো তাদের হাতেই। বিচার তখন ক্রয়-সামগ্রীতে পরিণত হয়নি,আদালতের নামে উকিল-ব্যারিস্টারদের বাজারও বসেনি। বিচারক হওয়ার পাশাপাশি তারা সেদিন পরিণত হয়েছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিজ্ঞ নির্বাচক মন্ডলিতেও। ফলে জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের ন্যায় যুদ্ধাপরাধী দুর্বৃত্তদের নির্বাচিত হওয়াটিই তখন অভাবনীয় ছিল। তখন নির্বাচিত হয়েছেন হযরত আবু বকর(রাঃ), হযরত ওমর(রাঃ,হযরত ওসমান(রাঃ)ও হযরত আলীর(রাঃ)ন্যায় জান্নাতের ওয়াদা লাভকারি মহান বেহেশতি মানুষেরা। সে সময় অন্যান্য দেশ জর্জরিত হচ্ছিল রাজতন্ত্রের স্বৈরাচারে।

তাই কোট-কাছারি প্রতিষ্ঠা করাটাই বড় কথা নয়। সঠিক রায় দানের নৈতিক সামর্থও থাকা চাই। লক্ষ্য হওয়া চাই,ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়কারির শাস্তি।এবং সে নির্দেশটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে এমন একদল মানুষ অবশ্যই থাকতে হবে যারা মানুষকে কল্যাণের পথে ডাকবে। ন্যায়ের নির্দেশ দিবে এবং অন্যায়কে রুখবে। এবং তারাই হল সফলকাম।”- (সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৪)। তাই ইসলামে একাজ ইবাদত। বিপরীত কাজটি হল আল্লাহর অবাধ্যতা। সৎ ও ন্যায়পরায়ন ব্যক্তিদের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া তাই নিছক রাজনীতি নয়, এটিই ইসলামের মৌলনীতি। সাহাবাগণ এ লক্ষ্যে বহু জ্বিহাদ লড়েছেন। নির্বাচনের মাধ্যমে এ কাজ যদি শান্তিপূর্ণ ভাবে হয় তবে জাতি এক রক্তক্ষয় থেকে বাঁচে। আর সেটি ব্যর্থ হলে ব্যর্থ হয় নির্বাচন বা ভোটদান। তাই বার বার নির্বাচন হওয়াটাই বড় কথা নয়। ইবাদতের দায়িত্ব-পালনও হওয়া চাই। ন্যায়পরায়ন ব্যক্তিদের বিজয় এবং দুর্বৃত্তদের পরাজয়ও হওয়া চাই। নইলে দেশের উপর দখলদারি নেয় ক্ষমতালিপ্সু নেতারা।এক কালে এ লক্ষ্যে নমরুদ-ফেরাউনেরা প্রকান্ড যু্দ্ধে লিপ্ত হত। আর এখন তাদের উত্তরসুরীরা লিপ্ত হচ্ছে নির্বাচনে। যে দেশে এরশাদের ন্যায় শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধী পাঁচটি নির্বাচনী আসন থেকে নির্বাচিত হয়, নির্বাচিত হয় জয়নাল হাজারী বা শামীম ওসমানীর ন্যায় দুর্বৃত্তরা -সেদেশে নির্বাচক মন্ডলীর রায়-প্রদানের সামর্থ যে কতটুকু তা নিয়ে কি বুঝতে বাঁকী থাকে? বিচার কাজে জেলা, এলাকা, দল বা পরিবার নিয়ে পক্ষপাতিত্ব করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তেমন পক্ষপাতিত্বের কারণে যে কোন সভ্য দেশে বিচারক চাকুরী হারায়। বরখাস্ত হয় জুরিস্ট। আর ইসলাম ধর্মে এটি মহাপাপ। এমন পক্ষপাতিত্বে শাস্তি বাড়ে আখেরাতে। তাই প্রকৃত মুসলমান দেখে কোনটি ন্যায়, আর কোনটি অন্যায়। দেখে কে সৎ আর কে অসৎ। ঈমানদার ব্যক্তি বাদী-বিবাদীর গায়ের রঙ, ভাষা বা এলাকা দেখে না। অথচ জাতিয়তাবাদ, বর্ণবাদ, আঞ্চলিকতা ও ট্রাইবালিজম জনগণের সে সামর্থটিকেই হরণ করে। অথচ বাংলাদেশে এসব মতবাদের চর্চাই প্রবল ভাবে বেড়েছে। মুখের ভাষা বাংলা না হওয়ার কারণে একাত্তরে বহু হাজার বিহারী ও পাকিস্তানীকে হত্যা করা হয়েছে। দখলে নেওয়া হয়েছে তাদের বাড়ীঘর ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে। এমন একটি হিংস্র ও দখলদারি চেতনায় কি ব্যক্তির সামর্থ থাকে ন্যায় ও সত্যের পক্ষ নেওয়ার? নেই বলেই দেশে বার বার অসম্ভব হচ্ছে সৎ ও যোগ্য মানুষের নির্বাচন। যদি ইসলামের আরবী-ভাষী নবী স্বয়ং প্রার্থী হতেন ক’জন বাঙ্গালী তাঁকে ভোট দিতেন? ক’জন সমর্থন করে নবীজী (সাঃ)রইসলামি শিক্ষা, শরিয়তী বিচার ব্যবস্থা ও সূদমূক্ত অর্থনীতিকে? দেশের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ কি দেশে সে পরিবেশ রেখেছেন? এমন বিভ্রান্ত চেতনায় দেশে নির্বাচন একবার নয়, হাজার বার হলেও কি কল্যাণ হবে? তাছাড়া বাংলাদেশের যে বিভাজন সেটি কি শুধু রাজনৈতিক? এটি তো দর্শনগত তথা আদর্শগতও। তাই কেনিয়া, কঙ্গো, জিম্বোবুয়ে বা থাইল্যান্ডের বিভাজনের চেয়েও এ বিভাজন গুরুতর। রাজনৈতিক উত্তাপের চেয়ে আদৌ কম নয় এসব বিভক্ত মানুষের অন্তরের উত্তাপ। ফলে এ বিভাজন নিছক কিছু বৈঠক করে দূর হওয়ার নয়। নির্বাচন করেও নয়। এমন অবস্থায় নির্বাচন যেটি প্রসব করে সেটি শান্তি নয়, সুখ-সমৃদ্ধি ও সম্প্রীতিও নয়। বরং তা হল সংঘাত, যুদ্ধ ও বিপর্যয়। বাংলাদেশ কি সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে না?

VN:F [1.0.8_357]
রেটিং: 0.0/5 (0 ভোট)
বুকমার্ক:
  • Facebook
  • Google
  • Digg
  • Technorati
  • del.icio.us
  • Live
  • YahooMyWeb

ট্যাগঃ



ট্র্যাকব্যাকঃ

মন্তব্য করুন!

এই পোস্টের কমেন্ট ফিড সাবস্ক্রাইব করুন!

লগ ইন করতে চান?

আপনার মন্তব্য বা আপনার সাইটের ট্র্যাকব্যাক যোগ করুন। ভালো, সুন্দর, টপিক কেন্দ্রিক মন্তব্য করুন। স্প্যাম না করার অনুরোধ রইলো।

Ekushey Inline virtual Bangla keyboard
------------(মাউস ক্লিক করে বাংলা লিখুন)------------

Subscribe without commenting.

:) :( ;) :D ;;) >:D< :-/ :x :"> :P =(( :-O X( :> B-) :-S >:) :[ :] :| =)) :-B :-h I-) <:-P :-? =D> :-w :!! :-" :-$ =P~ (*) (Y) (N) (^) (D) (C) (B) (G) (F) (W)