প্রথম পাতা » ব্লগরব্লগর

মানবিক বোধ সম্পন্ন গাড়ী বিষয়ক জটিলতা ( কল্পগল্প)

লিখেছেন: আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

সোমবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ – ১০:২৮ পূর্বাহ্ন টি মন্তব্য

গাড়ীটা ভালই চলছিলো। কেনার তিন বছরের মধ্যে তেমন কোন সমস্যা হয়নি। আমিও খুশী - এমন গাড়ীইতো চাই। তেল ভরবো - আর স্টার্ট দেব। কোন ধানাই পানাই নেই - কোন মিস্ত্রী সংক্রান্ত ঝামেলাও নেই।

সমস্যা হলো একদিন। চালাচ্ছিলাম একটা লোকাল রোডের উপর দিয়ে - হঠাৎ করে গাড়ীটা দেখি রাস্তার পাশে ঘাসের দিকে চলে যাচ্ছে। মহা বিপদ! কোন ভাবেই গাড়ীটাকে রাস্তার উপর রাখতে পারলাম না। রাস্তার পাশে জঙ্গলমতো এক জায়গায় গিয়ে থেমে গেল গাড়ীটা। আমিতো অবাক - আবার কিছুটা ভয় পেলাম। ঘটনাটা কি? গাড়ীটা কি, গাড়ীটাকে কি ভুতে পেল নাকি?

দাড়ানো গাড়ীটা থেকে বাইরে এসে দেখি গাড়ীটার একজস্ট পাইপ দিয়ে সেমিসলিড ধরনে কালো পদার্থ বেড়িয়ে আসছে - দেখে মনে হলো গাড়ীটা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছে - গাড়ীর ইঞ্জিন থেকেও এক ধরনের আওয়াজ বেড়িয়ে আসছে - যা কিনা নিয়মিত ইসুবগুলের ভুসি খাওয়া কোন একজন যখন তা খেতে ভুলে যায় তার যে অবস্থা হয় তেমনি।

সেই বাহ্য শেষ হতেই ঝরঝর করে পানি বেড়িয়ে এলো - মনে হলো গাড়িটা মুত্রত্যাগ করছে। তারপর হঠাত গাড়ীটা স্টার্ট হয়ে হালকা একটা হর্ন বেজে উঠলো। মনে হলো আমাকে গাড়ীতে উঠতে বলছে। ভয়ে ভয়ে উঠলাম গাড়ীতে - কিন্তু উঠার পর সবই মনে হলো স্বাভাবিক।

পরিস্থিতি বিবেচনা করে গন্তব্য বদলে ফেললাম। চলে এলাম একটা মেকানিক শপে। এই গাড়ীর আবার ঝামেলা আছে - আগের দিনের মেকানিকরা যেমন বনেট খুলে - উঁকিঝুকি মেরে বা শব্দশুনে গাড়ীর সমস্যা বুঝার চেষ্টা করতো - এখন আর তা হয়না। গাড়ীর মধ্যে একটা ব্লাকবক্স ধরনের কি একটা আছে - যার সাথে একটা ডিকোডার লাগিয়ে গাড়ীর আদ্যপান্ত ইতিহাস বের করা যায়।

ভিতর থেকে হন্তদন্ত হয়ে দুইজন মেকানিক বের হয়ে এলো। এদের হাতে বিরাট এক রিপোর্ট। রিপোর্টটা টেবিলের উপর ফেলে হতাশ কন্ঠে একজন বলে উঠলো - হোয়াট দ্যা হেল ইজ দ্যাট।

আমি রিপোর্টটা হাতে নিয়ে চোখ বুলাতেই দেখলাম -

৯:৩০ সকাল - প্রচন্ত বেগ হচ্ছে - আমার পক্ষে আগানো সম্ভব নয়
৯:৩১ সকাল - নিজে নিজে ঝোপের দিকে চরলাম
৯:৪৫ সকাল - আহ! কি আরাম - এবার চলা যাবে।

আমি তো হতবাক। বলে কি? গাড়ীতো দেখি মানুষের মতো ভাবছে। রিপোর্টের নীচে ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সান কলামে লেখা পড়ে বুঝা গেল আসলে ঘটনা কি হয়েছে।

সেখানে লেখা আছে - জ্ঞানী মানুষের আলোচনা ইন্টারসেপ্ট করে গাড়ীকুল জানতে পারে যে - মানুষ ভাত খায় আর গাড়ী তেল খায়। সেখান থেকেই গাড়ীদের বিবর্তন শুরু হয়েছে। যেহেতু মানুষ ভাত খেয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয় - তেমনি গাড়ীও তেল খেয়ে সেই কাজ শুরু করেছে।

এই পর্যণ্ত পড়ে চোখ ছানাবড়া করে বসে থাকা মেকানিক দুইজনের দিকে তাকিয়ে বললাম - ডোন্ট ও্যারি, আই কে হ্যান্ডেল ইট।

তারপর থেকে প্রতিদিন সকালে কাজে যাওয়ার আগে রাস্তার পাশে একটা জঙ্গল দেখে গাড়ীটা থামাই - পাঁচ মিনিটের ব্রেকেই কাজটা শেষ হয়ে যায়। তারপর সারাদিন ভাবনা মুক্ত।

পাঠক, ঘটনা এখানে শেষ হরে হয়তো এই গল্পটা আপনাদের বলতাম না। এরা কিভাবে যে বিবর্তন বাদের সকল সূত্রগুলো জেনে ফেলেছে তাই ধীরে ধীরে মানুষের মতো আচরন করছে।

(২)

বিবর্তিত গাড়ীর প্রকৃতির ডাক নিয়ে জটিলতা কোন ভাবে সামাল দেওয়া গেল। কিন্তু মনের মধ্যে খচখচ ভাব রয়েই গেল। যদি পুলিশ টের পায় - তাইলে বিপদ। এই ভাবনা নিয়ে যখন গাড়ী চালাচ্ছি - তখন নতুন করে আরেক ঝামেলা এসে উপস্থিত। সেই ঘটনাটাই বলি।

একদিন তিন লেনের একটা রাস্তায় গাড়ী চালাচ্ছি। বেশ ভীড়ের রাস্তা। আমি আছি সবচেয়ে ডানের লেনে। হটাৎ করে গাড়ীটা একটু দোলে উঠলো। ভাবলাম হয়তো চাকার নীচে কিছু একটা পড়েছে - যা প্রায় অসম্ভব। তারপর দেখি স্টিয়ারিংটা বামে ঘুরে যাচ্ছে। আমিতো অসহায় - কি করি - স্টিয়ারিংকেই অনুসরন করলাম। গাড়ীটা একদম বামের লেনে এসে হাজির। সামনে তাকিয়ে দেখি একটা লাল রঙএর প্রডো গাড়ী। কি সমস্য - আমার গাড়ীটা কেমন যেন দুলছে আর মনে হচ্ছে সামনের গাড়ীটার দৃস্টি আকর্ষনের চেষ্টা করছে।

কয়েকটা সিগন্যাল পর প্রডোটা একটা গলিতে ঢুকে গেলে আমি আপাতত রক্ষা পেলাম। মনে হলো হতাশ ভঙ্গিমায় দেবদাসের মতো করে আমার গাড়ীটা এগিয়ে চলছে।

এর পর থেকে শুরু হলো এই উপদ্রুপ। ছোট্ট সুন্দর আর দামী স্পোর্টস কার দেখলেই আমার গাড়ীটা কেমন যে উতলা হয়ে উঠে - বিপজ্জনক ভাবে লেইন পরিবর্তন করে - দুলনী তৈরী করে। এই সমস্যা যখন বিপজ্জনক পর্যায়ে উপনীত হলো তখন আবার মেকানিক শপে গেলাম।

আমাকে দেখেই মেকানিক হৈ হৈ করে উঠলো।

“আরে এই তো সেই লোক - এই লোকই আপনাকে সাহায্য করতে পারে।” - বলছিলো মেকানিকটা। পাশে দাড়ানো লোকটি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো - আই নিড ইয়োর হ্যাল্প।

বুঝলাম ওর গাড়ীও বিবর্তনের ধারায় এগিয়ে গেছে। একটু মুচকি হেসে বললাম - আমি মহা ভেজালে আছি। মনে মনে ভাবলাম - ব্যাটা, ধৈর্য্য ধর। তাড়াতাড়িই গাড়ীর জন্যে বাথরুম সার্ভিস চালু করবো।

যথারীতি ডিকোডার লাগিয়ে গাড়ীর ইতিহাস বের করা হলো। রিপোর্টে যা দেখলাম তাতে আমার ভিমড়ি খাবার যোগাড়। লেকা আছে - বিবর্তনের এই পর্যায়ে এদের মধ্যে ভালবাসা নামক একটা অনুভুতির জন্ম হয়েছে।

সর্বনাশ। এরপর কি হবে? হয়তো দেখা যাবে গাড়ীটা ডেটিং শুরু করবে। তারপর হয়তো প্রাগন্যান্সির বিষয়টা আসবে। কিভাবে কি হবে তা ভেবে মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে।

বিলটা পরিশোধ করে মেকানিক শপ থেকে বেড়িয়ে এলাম।

এখন ভাবছি - গাড়ীর এই বিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে কি একটা বানিজ্যিক রাস্তা খুলবো - যাতে গাড়ীর বাচ্চা বিক্রি করে হযতো মিলিয়ন ডলারের মালিক হয়ে যাবো - নাকি আপাতত গাড়ীটাকে স্টেরিলাইজড করে বলদ বানিয়ে গাড়ীর যান্ত্রিক সুবিধাটাই নেব।

(নোট: একজন প্রিয় ব্লগারের মানুষ আর গাড়ীকে একই ভাবে বিবেচনা করায় এই গল্পের ধারনাটা মাথায় আসলো। আশা করি এই কল্পগল্পটি যন্ত্রের সাথে মানুষের তুলনা করে যুক্তি দেওয়ার অন্তসার শূন্যতাটা বুঝাতে পেড়েছি। পাঠক যদি আনন্দ পেয়ে থাকেন - তাহলে আমার সময়টা সার্থক হিসাবে বিবেচনা করা হবে। ধন্যবাদ সবাইকে।)
(প্রিয় ব্লগার রাশেদ, যে আমার ব্লগের নিয়মিত পাঠক, তার জন্যে লেখাটি আমার ব্লগে দেওয়া হলো)

বুকমার্ক:
  • Facebook
  • Google
  • Digg
  • Technorati
  • del.icio.us
  • Live
  • YahooMyWeb

২ votes, average: 5 out of 5২ votes, average: 5 out of 5২ votes, average: 5 out of 5২ votes, average: 5 out of 5২ votes, average: 5 out of 5 ( ভোট, গড়: 5/5)
লগ ইন করুন রেটিং এর জন্য!
Loading ... Loading ...

ট্যাগঃ


  • রাশেদ
    রাশেদ ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ১০:৪৪ পূর্বাহ্ন

    আহা! ঝরঝরে গল্প পড়ে ফেললাম অনেকদিন পর। ভাল্লাগছে।

    কার সাথে মানুষ গাড়ি নিয়ে ভেজাল হইছিলো বুঝি নাই। ব্লগ তেমন ট্র্যাক করার টাইম পাই না ইদানিং। :|

    থ্যাঙ্কস আপনাকে। প্রিয় পোস্টে নেয়ার উপায় নাই, থাকলে নিয়ে নিতাম।

    (Y) (Y)

  • রাশেদ
    রাশেদ ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ১০:৪৪ পূর্বাহ্ন

    ঘুমাতে যাই। :-)

  • ashik
    ashik ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ১১:০৩ পূর্বাহ্ন

    পড়লাম ! কল্প কাহিনী কল্পনা করলাম ! বাহবা !

  • বাউল
    বাউল ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ২:০৪ অপরাহ্ন

    ভালো লেগেছে গল্পটা। (Y)

  • রাশেদ
    রাশেদ ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ১০:৪৬ অপরাহ্ন

    ঠেলা।

  • মুকুল
    মুকুল ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ১০:৫৩ অপরাহ্ন

    (Y)

ট্র্যাকব্যাকঃ

মন্তব্য করুন!

এই পোস্টের কমেন্ট ফিড সাবস্ক্রাইব করুন!

আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে মন্তব্য করার জন্য!